সিলিটে শতাধিক পরিবারকে নিঃস্ব করা আহবাব এখন লন্ডনের কোটা নেতা


প্রতি লাখে মাসে ২০ হাজার টাকা লভ্যাংশ প্রদানের লোভ দেখিয়ে বিভিন্ন পেশাজীবী ও মধ্যবিত্ত পরিবার, এমনকি রিকশা চালক ও শ্রমিকদের শেষ সম্বল হাতিয়ে নেয়া সিলেট ছাত্র শিবিরের নেতা এখন নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ সাধারন ছা্ত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ যুক্তরাজ্য শাখার। কোটা সংস্কারের জন্য ইতিমধ্যে যুক্তরাজ্য প্রবাসীদের কাছ থেকে বিপুল অংকের টাকাও সংগ্রহ করেছে এবং করছে।

সিলেট জেলা ছাত্রশিবিরের সহসভাপতি আহবাব আহমদের নেতৃত্ব শিবিরের একটি প্রতারক চক্র বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে প্রতারণার মাধ্যমে আনুমানিক ৩০ কোটি টাকা আত্মসাত করলেও নিজ দলের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে নেয়া সাত কোটি টাকা ফেরত দেয়। প্রতারক আহবাব বর্তমানে জামায়াত নেতা চৌধুরী মাঈনুদ্দিনের সহযোগিতায় লন্ডনে এসে জামায়াতের রাজনীতির পাশাপাশি কোটা আন্দোলন সংগঠিত করছে।

এই প্রতারক চক্রের খপ্পরে পড়ে অনেকেই লোভে ১ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে আহবাবের কথিত ব্যবসায় অংশীদার হয়েছিলেন। কারো সঙ্গে লেয়ার মুরগির খাদ্য কেনাবেচার, আবার কাউকে সিলেটের ইবনে সিনা হাসপাতালের শেয়ার বিক্রির ভুয়া চুক্তিপত্র দিয়ে প্রতারণা করেছেন এই শিবির নেতা।

প্রতারক শিবির নেতা কোটা আন্দোলনের সংগঠক আহবাব আহমেদ

প্রতারক শিবির নেতা কোটা আন্দোলনের সংগঠক আহবাব আহমেদ

প্রতারণার শিকার একজন সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার রানাপিং ছত্রিশ গ্রামের ময়না মিয়া। তিনি ইবনে সিনা হাসপাতালের দুটি শেয়ার ক্রয়ের চুক্তিপত্র নিয়ে ২ লাখ টাকা খুইয়েছেন। ওই চুক্তিপত্রের কপি এ প্রতিবেদকের কাছে সংরক্ষিত রয়েছে। এ ছাড়া অনুসন্ধানে এ প্রতিবেদকের হাতে আহবাবের প্রতারণার বেশ কিছুু তথ্য-প্রমাণ আসে।

এ রকম নানা জনের কাছে নানা কৌশলে প্রতারণা করে লাপাত্তা প্রতারক আহবাব। অভিযোগে জানা যায়, আহবাব শুধু সিলেটের বিভিন্ন উপজেলার জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীদের কাছ থেকে প্রতারণা করে নেয়া ৭ কোটি টাকা ফেরত দেয়ায় শিবিরের দায়িত্বশীল কেউই এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে নারাজ।

প্রতারণার বিষয়টি লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ায় এ নিয়ে গোলাপগঞ্জ উপজেলাজুড়ে তোলপাড় হয়।

শিবির নেতা আহবাব গোলাপগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ছত্রিশ গ্রামের রিয়াজ উদ্দিনের বড় ছেলে। আর্থিক অবস্থা ভালো না থাকায় বিভিন্ন বাড়িতে প্রাইভেট পড়াতেন তিনি। গত কয়েক বছর থেকে তার চলাফেরায় পরির্বতন আসে। একে একে ৪টি সিএনজি অটোরিকশা, একটি পিকআপ ভ্যানসহ দামি মোটরসাইকেল ক্রয় করেন তিনি। আহবাব ছাত্রশিবির গোলাপগঞ্জ পশ্চিম শাখার সভাপতি ও কিশোরকণ্ঠ পাঠক ফোরামের অফিস সম্পাদক ছিলেন। বর্তমানে সিলেট জেলা ছাত্রশিবিরের সহসভাপতি। গোলাপগঞ্জ উপজেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুহিবুল্লাহ হোসনেগীর এ প্রতিবেদকের কাছে আহবাবের দলীয় নেতাকর্মীর টাকা হাতিয়ে নেওয়ার কথা স্বীকার করলেও দল এ প্রতারণার সঙ্গে জড়িত নয় বলে দাবি করেন মুহিবুল্লাহ।

অনুসন্ধানে ২০১৬ সালের একটি ছবিতে দেখা যায়, তৎকালীন সময়ে শিবিরের মাসিক ম্যাগাজিন কিশোরকণ্ঠ পাঠক ফোরামের একটি অনুষ্ঠানে আহবাবের সঙ্গে এক সারিতে আছেন গোলাপগঞ্জ উপজেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুহিবুল্লাহ হোসনেগীর ও আহবাব। ওই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন কিশোরকণ্ঠ পাঠক ফোরামের সিলেট জেলা পূর্ব শাখার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও গোলাপগঞ্জ উপজেলা শিবিরের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুল্লাহ দস্তগীরসহ আরো অনেকে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিবিরের একজন সাথী এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।

প্রতারক আহবাবের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতারণার শিকার অনেকেই সেখানে ভিড় করেছেন। এর আগে আহবাবকে বাড়িতে না পেয়ে প্রতারণার শিকার বেশ কয়েকজন রোববার বিকালে আক্রমণ করে ঘরের ফ্রিজ, টিভি, খাট, ৪টি সিএনজি অটোরিকশা, একটি পিকআপ ভ্যান, শ্যালো মেশিন, এমনকি বাড়ির প্রধান গেট যে যা পেয়েছেন নিয়ে গেছেন।

সিলেট শহরের তালতলায় বসবাসকারী প্রতারণার শিকার একজন বলেন, আহবাবের সঙ্গে তার এক আত্মীয়ের মাধ্যমে পরিচয়। এরপর কয়েকজন বন্ধু মিলে প্রায় ১০ লাখ টাকা আহবাবের কথিত ফার্মের ব্যবসায় বিনিয়োগ করেছিলাম। আহবাব লাপাত্তার খবর শুনে তার বাড়িতে এসেছি।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে আহবাবের ব্যবহৃত মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি। বাড়িতে থাকা আহবাবের মা নাছিমা বেগম জানান, শনিবার রাত থেকে ছেলের খোঁজ জানি না। রোববার থেকে লোকজন আহবাবকে না পেয়ে বাড়ির সবকিছু লুটে নিয়েছে। আমি এসব বিষয়ে কিছুই জানি না। আমার ছেলে নির্দোষ।

স্থানীয় বাজারের ব্যবসায়ী আব্দুল কুদ্দুস টিপু জানান, চলতি বছরের ২৯ মার্চ ফার্মের মুরগির খাবারের ব্যবসার কথা বলে চতুর আহবাব তার কাছ থেকে ৬ লাখ ৬০ হাজার টাকা নিয়ে এক টাকাও ফেরত দেয়নি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে সরকারদলীয় একজন সমর্থক জানান, তার ভাইয়ের কাছ থেকে ১২ লাখ টাকা প্রতারণার মাধ্যমে নিয়েছিল আহবাব। এর মধ্যে ৮ লাখ টাকা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন।

জকিগঞ্জ উপজেলার কামালপুর গ্রামের বদরুল হকের ছেলে সোহেল আহমদ জানান, তিনি ১০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন আহবাবের কথায়। তাকেও মুরগির ফার্মের ব্যবসার কথা বলে টাকা নেন। পরে ইসলামী ব্যাংকের একটি চেকও দেন। ভুটিটিকর ছত্রিশ গ্রামের মুহিব আলী মাস্টারের নাতি পিন্টুর ৫ লাখ টাকা, ছত্রিশ গ্রামের জালাল মিস্ত্রি ৭০ হাজার টাকা, গোলাপগঞ্জ ইউনিয়নের চকরিয়া গ্রামের কামরুল ইসলামের ৭ লাখ টাকা, বিয়ানীবাজার উপজেলার চন্দগ্রাম গ্রামের ব্যবসায়ী আবু বকরের ৫ লাখ ৬০ হাজার টাকা, একই উপজেলার খাদিম উলি গ্রামের রুনু মিয়ার ২ লাখ টাকাসহ কয়েকশ’ লোকের প্রায় ৩০ কোটি টাকা নিয়ে পালিয়েছেন আহবাব।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, আহবাব ফেব্রুয়ারি মাসে সিলেটের তামাবিল-ডাউকি সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশের ভিসা ইস্যু করিয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, সে ভারত চলে গেছে। আহবাবের পাসপোর্ট নাম্বার বিএইচ ০১৫৬৯৮০। পাসপোর্টে দেওয়া তথ্যে তার জন্ম ২৫ ডিসেম্বর ১৯৮৭ ইংরেজি এবং জাতীয় পরিচয় পত্র নং ১৯৮৭৯১১৩৮৫১২০৩২৬।

গোলাপগঞ্জ মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ জানান, প্রতারণার বিষয়ে মৌখিক অভিযোগ পেয়েছি। কেউ লিখিত অভিযোগ করেনি। লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জানা গেছে প্রতারণা করে আত্মসাতকৃত টাকার একটি অংশ শিবিরকে দেয়ায় তারা ভুক্তভোগীদের প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে অভিযোগ করা থেকে বিরত রেখেছেন।

%d bloggers like this: