“বদল আল এয়ানত” : মওদুদী জামাতের বিকৃত যৌনাচারের রাজনৈতিক ফতোয়া

আবদুল্লাহ আরাবী:  জামায়াতে ইসলামীতে সদস্যদের মাসিক চাঁদাকে এয়ানত বলা হয়। কিন্তু জামায়াতের কোনো সদস্যের যদি মৃত্যু হয় কিংবা কারাদণ্ড হয় বা সংসারের ব্যয়ভার বহন করতে অক্ষম হয়, সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শাখা সেই পরিবারের ভরণপোষণ করে। শাখা আমীর বা আমীরের অনুমতিতে অন্য কোনো সদস্য এ দায়িত্ব পালন করতে পারে। এটুকুতে সীমাব্ধ থাকলে আপত্তির পরিবর্তে প্রশংসিত হতো। কিন্তু সাহায্যকারী/দায়িত্বগ্রহণকারী নেতা অনুপুস্থিত বা সাংসারিক ব্যয়ভার বহনে অক্ষম নেতা বা কর্মীর স্ত্রীকে ভোগ করবে, উপরন্তু তার গর্ভে অন্তত একজন সন্তানের জন্ম দিবে এ উদ্ভট ফতোয়ার নাম দেয়া হয়েছে “বদল আল এয়ানত”। এটি জাহেলি যুগে প্রচলিত ছিল।

মওদুদী তার অনুসারীদের বহু সন্তান জন্ম দিতে অনুপ্রাণিত করতো একথা সকলেই অবগত। তার উদ্দেশ্য ছিল সন্তান জন্মদানের মাধ্যমে নিজ দলের ক্রমবিকাশ। দলীয় কার্যক্রম শুরুর পরই মওদুদীকে ইসলাম বিরোধী আখ্যা দিয়ে মাওলানা আমীন আহসান ইসলাহী, ড. ইসরার আহমেদসহ ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান আছে এমন ব্যক্তিগণ দল ত্যাগ করে। তাঁরা মওদুদী ও জামায়াত সম্পর্কে শরীয়তগত সমালোচনা করেন। বলা হয়, জামায়াতে ইসলামী-ই পৃথিবীতে একমাত্র সংগঠন যার প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদকসহ প্রতিষ্ঠাকালীন সকল সদস্যই পরবর্তীতে উক্ত সংগঠন ত্যাগ করেছিলেন।

মূলত “বদল আল এয়ানত”কে কেন্দ্র করে সর্বশেষ দল ত্যাগ করেন মাওলানা মনজুর নোমানি। তিনি যখন আশির দশকে মওদুদীর বিকৃত যৌনাচার প্রথা বদল আল ইয়ানত সম্পর্কে মুখ খোলে তখন পাকিস্তান ছাড়াও মিশর ও তুরস্কেও আলোড়ন সৃষ্টি হয়। কিন্তু পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক জান্তা জিয়াউল হকের সরাসরি হস্তক্ষেপে নোমানি রচিত “মাওলানা মওদুদীর সাথে সাহচর্যের ইতিবৃত্ত” গ্রন্থের সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশ করা হয়। মানহানি মামলা, রাষ্ট্র কর্তৃক হুমকি এবং জামায়াতের দলীয় নেতারা এ নিয়ে মুখ না খোলায় তার করার কিছু ছিল না। তাই পাকিস্তান সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রশমন করে সে যাত্রায় জামায়াতে ইসলামী রক্ষা পায়।

বদল আল এয়ানতের নেপথ্যে মার্গারেট মাসকাস নামে এক নারীর ভূমিকা রয়েছে। সেই মহিলা যুক্তরাষ্ট্রে কয়েকজন শেতাঙ্গ কর্তৃক ধর্ষিত হওয়ার পর ১৯৫৭ থেকে ৫৯ সাল পর্যন্ত মানসিক চিকিৎসাধীন ছিলেন। সিআইএর আমন্ত্রণে মওদুদী যুক্তরাষ্ট্র গমন করলে মার্গারেটের সাথে মওদুদীর অনৈতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এক পর্যায়ে সে পাকিস্তানে চলে আসে এবং ইসলাম গ্রহণ করে মরিয়ম জামিলা নাম ধারণ করে মওদুদীর বাসায় বসবাস শুরু করে। এ নিয়ে পারিবারিক কলহ এবং নানামুখী সমালোচনার কারণে মওদুদীর ছাপাখানার কর্মচারী মোহাম্মদ ইউসুফ খানের সাথে বিবাহ দেয়া হয়। মরিয়ম জমিলা ইসলাম কায়েমে সশস্ত্র সংগ্রাম নিয়ে কয়েকটি গ্রন্থ রচনা করেছে। জামিলাকে বিবাহ করার কারণে ছাপাখানার কর্মচারী ইউসুফ জামাতে ইসলামীর অন্যতম নেতায় পরিণত হয়। ধারণা করা হয় মরিয়ম জামিলাকে ভোগ করা শরীয়তসম্মত করতেই বদল আল এয়ানত ধারণার সূত্রপাত এবং ইউসুফ-জামিলার পাঁচ সন্তানের মধ্যে একজনের চেহারা হুবহু ফারুক মওদুদীর মতো।

সুন্নী মতাদর্শের সকল দলই যার বিরোধী সেটি হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। ওলামায়ে দেওবন্দ, কওমী ও সুফিবাদী সকলেই মওদুদীকে কাফের ফতোয়া দিয়েছে। মওদুদী জামাতকে খারেজি ও পথভ্রষ্ট বলে ফতোয়া দিয়েছে নাসিরউদ্দিন আলবানিসহ আহলে হাদিস বা সালাফি আলেম-ওলামাগণ। অনেকে বলেন, জামাত হচ্ছে শিয়া মতাদর্শের একটি শাখা যারা শুধুমাত্র রাজনৈতিক ফায়দার জন্য সুন্নী বলে পরিচয় দেয়। লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে কোনো সুন্নি আলেম-ওলামা শিয়াদের রেফারেন্স ব্যবহার না করলেও মওদুদী তাদেরকে অনুসরণীয় হিসেবে গণ্য করে। তার লেখা তাফহীমুল কোরআন ব্যাখ্যায় ব্যবহার করা হয়েছে বাইবেলের সূত্র। অথচ সকল আলেমরা একমত যে বাইবেল মূল ফর্মে নেই।

প্রকৃতপক্ষে জামায়াতে ইসলামী একটি নতুন ধর্ম যার সৃষ্টি করেছে সিআইএ ও মোসাদ। ১৪শ বছরে যে ব্যাখ্যা কোন আলেম দেননি, যে মতবাদের সাথে ইসলামের মিল রয়েছে শুধু নামমাত্র, যে মতবাদে হুকুমতে ইলাহি ভাবধারায় ইসলামের মূল ভিত্তিকে যে পরিবর্তন করে দিয়েছে, যার মতে নামাজ, রোজা ট্রেনিংমাত্র মূল লক্ষ ক্ষমতা দখল, সেটি নতুন ধর্ম ছাড়া আর কিছুই হতে পারে নি। এ কারণেই যা কোরআন হাদিসের আলোচনা বলে পরিচিত হওয়ার কথা তাকে বলা হয়েছে মওদুদী সাহিত্য। এছাড়া মওদুদী সকল নবী-রাসুল ও সাহাবায়ে কেরামের সমালোচনা করেছে তার মূল লক্ষ্য ছিল সকলকে দোষী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে নিজেকে মূল ব্যক্তিতে পরিণত করা। অবশ্য এক্ষেত্রে জামাত সফল কারণ জামাত-শিবির শুধু মওদুদীকেই নয়, তাদের নেতাদেরও নিস্পাপ বলে গণ্য করে। পীরবাদের সমালোচনা করলেও তারা সম্পূর্ণভাবে মওদুদী কেন্দ্রিক। এমন কি রাসুলের বিরুদ্ধে লেখার সমালোচনা করা হলে জামাতের পক্ষ থেকে যুক্তি দেয়া হয় ওমুক আলেম এই কথা বলেছে।

জামায়াতে ইসলামী নিজেদের যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল বিরোধী বলে দাবি করে। অথচ মওদুদীর গোলাম আহমেদ কাদিয়ানির পর মওদুদী একমাত্র ব্যক্তি যার বই নিয়ে রকফেলার ফাউন্ডেশনসহ ইসরাইলি লবির দুটি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা করে। মওদুদী যদি ইসলামের কথা বলতো তাহলে গবেষণা হওয়ার কথা কোরআন-হাদিস নিয়ে, মওদুদী নিয়ে নয়। তাদের সুপারিশেই আলেম ওলামাদের প্রতিবাদ সত্ত্বেও সৌদি আরব থেকে পুরস্কার পেয়েছিল। অবশ্য পরবর্তিতে মওদুদী জামাতের মুখোশ উন্মোচন করে বিভিন্ন অডিও-ভিডিও ও বই প্রকাশ করে তার প্রায়শ্চিত্ত করে সৌদি আরব।

মওদুদীর বই মদিনায় পড়ানো হয় বলে প্রচার করা হয়, অথচ তার বই শুধুমাত্র ইরানে পড়ানো হয় এবং তার কারণ খোলাফায়ে রাশেদিনের সমালোচনা করা। মওদুদীর গায়েবী জানাজা সৌদি আরবে পড়ানো হয়েছে বলে প্রচার করা হয় অথচ তার লাশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে পাকিস্তানে আসার পর জানাজা হয়েছিল। এছাড়া যে গায়েবী জানাজার কথা বলা হয় সেটি বিদাত এবং শরীয়ত বিরোধী বলে সর্বসম্মত রায় রয়েছে। এভাবে সম্পূর্ণ মিথ্যার উপর মওদুদীকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।

“বদল আল এয়ানত” নামে যে জাহেলি পদ্ধতি মওদুদী উদ্ভাবন করেছে তা নিয়ে বেশকিছু লেখা প্রকাশ হলেও জামাতের সদস্যরা মৌন থাকায় এ নিয়ে কেউ সরব হয়নি। মূলত জামাতের নীতি নির্ধারণী মহল এ সম্পর্কে দিক নির্দেশনা দিয়ে থাকে। ধনী নেতারা অধীনস্তদের স্ত্রী-কন্যাকে ভোগ করার লোভে, আবার অবস্থার শিকার হওয়া নেতাকর্মীরা মানসম্মানের ভয়ে মুখ খুলে না। বাংলাদেশে বদল আল এয়ানতের নামে কোন নেতা কোথায় কোথায় সন্তান জন্ম দিয়েছে তা উদ্ঘাটন করা কিছুটা কষ্টসাধ্য হলেও এটি সময়ের প্রয়োজনে সুস্থ সামাজিক পরিবেশ বজায় রাখার জন্য অতীব প্রয়োজন।

[চলবে]

লেখক: আবদুল্লাহ আরাবী, বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ এবং ফিকহ ও রিজাল শাস্ত্র বিশেষজ্ঞ। মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাকাল্টি অব ইসলামিক ল থেকে উচ্চশিক্ষা সমাপ্তির পর বর্তমানে তিনি জেনারেল প্রেসিডেন্সি অফ স্কলারলি রিসার্চ এন্ড ইফটা এর বাংলা বিভাগীয় কো-অর্ডিনেটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

2 টি মন্তব্য to ““বদল আল এয়ানত” : মওদুদী জামাতের বিকৃত যৌনাচারের রাজনৈতিক ফতোয়া”

  1. পরবর্তী পর্ব কিভাবে পাবো????

  2. এভাবে মিথ্যা অপবাদ বা তোহমদ দিয়ে আখেরাতের জন্য কি অর্জন করলেন?অন্তত নিজে জামায়াতের সঙ্গে থাকার কারনে মনে হচ্ছে আপনার অন্তরে শয়তান বাসা বেঁধেছে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: