ঈদ উপলক্ষে অজ্ঞান পার্টি ছিনতাই ও চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য

অজ্ঞান পার্টি, ছিনতাইকারী আর চাঁদাবাজ- এই তিন সমস্যার ফাঁদে প্রতিদিন যাত্রা করছেন দেশের ৩৯টি রুটে চলাচলকারী ঈদের ঘরমুখো লাখ লাখ মানুষ। প্রতি বছরই নারায়ণগঞ্জের চিটাগাং রোড থেকে কাঁচপুর সেতুর চৌরাস্তা (পেট্রল পাম্প) পর্যন্ত এলাকায় অজ্ঞান পার্টি আর ছিনতাইয়ের শিকার হন ঘরমুখো মানুষ। তাছাড়া পরিবহনের চাঁদাবাজির ঘটনা যেন এই এলাকার জন্য অনেকটা বিধাতার বিধানের মতোই সত্য। কিন্তু গত এক সপ্তাহের পরিস্থিতি যেন ভিন্নতা এনেছে এই রুটের লাখ লাখ যাত্রীর জন্য। জানা গেছে, জেলা পুলিশের কঠোরতার কারণে গত সপ্তাহে পরিবহনের চাঁদাবাজি কমেছে বহুলাংশে। জেলা পুলিশের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, যোগাযোগমন্ত্রী ও পুলিশের বড় কর্মকর্তাদের কঠোর নির্দেশের কারণে পরিবহনে চাঁদাবাজি বন্ধ করতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশের নিয়মিত টিম ছাড়াও একাধিক গোয়েন্দা টিম কাজ করছে এসব এলাকায়। ইতিমধ্যেই চাঁদাবাজি রোধে পুলিশের দুই সার্জেন্টসহ ৪ সদস্যকে ক্লোজ করা হয়েছে। খোদ পরিবহন শ্রমিকরাই জানিয়েছেন, গোপনে চাঁদাবাজি চললেও ওপেন সিক্রেট চাঁদাবাজি প্রায় বন্ধ হয়েছে এখানে। তবে তাদের আশংকা ঈদ পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি বহাল থাকবে কি না। পাশাপাশি অজ্ঞান পার্টি আর ছোটখাটো ছিনতাইয়ের ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর সেতু হয়ে ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দিয়ে চলাচল করে দেশের ৩৯টি রুটের যানবাহন। বছরের অন্যান্য সময়ের চেয়ে ঈদ মৌসুমে এখানে পরিবহন চাঁদাবাজি অনেকটা ওপেন সিক্রেট। যখন যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় আসে চিটাগাং রোড হয়ে উঠে এই এলাকার নেতাদের জন্য অনেকটা আলাদিনের আশ্চর্য চেরাগের মতোই। প্রতিদিন চলাচলকারী হাজার হাজার যাত্রীবাহী বাস, মালাবাহী ট্রাককে গুনতে হয় নির্দিষ্ট পরিমাণের চাঁদা। তবে ঈদ মৌসুমে এই চাঁদার পরিমাণ বেড়ে যায় কয়েক গুণ। শুধু তাই নয়, দেশের মাদক পাচারের ও রাজধানীতে মাদক প্রবেশের অন্যতম প্রধান ট্রানজিট রুট হিসেবে পরিচিত এই এলাকার ক্ষমতাসীনরা মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও বছরে আয় করেন লাখ লাখ টাকা। স্থানীয়রা জানান, কোনো সরকার আমলে এই পরিবহনের চাঁদাবাজি পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করেন স্থানীয় এমপি অথবা কোনো আমলে নিয়ন্ত্রণ করেন ক্ষমতাসীন দলের কোনো শীর্ষ সন্ত্রাসী। তাই পরিবহন মালিক আর শ্রমিকদের কাছে চিটাগাং রোড বা কাঁচপুর সেতু হয়ে উঠেছে এক ভয়ের নাম। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রায়শই এই পরিবহন চাঁদাবাজির প্রামাণ্য সংবাদ প্রচার বা প্রকাশ হলেও প্রশাসন এখানে ঠুঁটো জগন্নাথ। অভিযোগ রয়েছে, চাঁদাবাজির টাকার ভাগ ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় নেতা থেকে শুরু করে ঢাকায় অবস্থানকারী পুলিশ ও ট্রাফিকের বড় কর্তাদের নাস্তার টেবিলে পৌঁছে যায়। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, ঈদ মৌসুমে এই অঞ্চলে পরিবহনের চাঁদাবাজির পাশাপাশি বৃদ্ধি পায় অজ্ঞান পার্টি আর ছিনতাইকারীদের দৌরাÍ্য। বিশাল যানজটের সুবিধা নিয়ে এই দুই অপরাধের কৌঁসুলিরা সাধারণ মানুষকে নিঃস্ব করে অহরহ। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর এসব ঘটনা বেশি ঘটছে। কাঁচপুর, সিদ্ধিরগঞ্জ, শিমরাইল এলাকার আশপাশের বেসরকারি ক্লিনিকগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত কয়েকদিনে অজ্ঞানপার্টির খপ্পরে পরে অনেকেই এসেছেন চিকিৎসা নিতে। তবে গত কয়েকদিন সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্নতা পেয়েছে। বাসে বাসে উঠে রসিদের মাধ্যমে চাঁদা নেয়ার দৃশ্য দেখা যায়নি। এ ব্যাপারে জেলা পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, সাদা পোশাকে একাধিক টিম কাজ করছে পরিবহনের চাঁদাবাজি বন্ধ করতে। ইতিমধ্যেই গত কয়েকদিনে কাঁচপুর থেকে ৫ চাঁদাবাজকে গ্রেফতার করে দ্রুত বিচার আইনে মামলা করা হয়েছে। এছাড়াও শিমরাইল ও রূপগঞ্জ থেকেও চাঁদাবাজিকালে হাতেনাতে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তাদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। দুজন সার্জেন্টসহ পুলিশের ৪ সদস্যকে ক্লোজ করার ঘটনাও স্বীকার করেছেন পুলিশ সুপার। তবে অজ্ঞান পার্টি ও ছিনতাইয়ের অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, দুই-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও এ ব্যাপারে কেউ এখনও আমাদের কাছে অভিযোগ করেননি।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: