আতংকে ক্রেডিট-ডেবিট কার্ডধারীরা

ক্রেডিট এবং ডেবিট কার্ড জালিয়াতির সঙ্গে খোদ ব্যাংক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট আইটি বিশেষজ্ঞরা জড়িয়ে পড়ায় চরম শংকায় গ্রাহকরা। ৫০ লাখ কার্ডধারী এখন আতংকের মধ্যে রয়েছেন। কার্ডধারী গ্রাহকের অনেকেই নিরাপত্তা সম্পর্কে জানেন না। সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য তেমন কার্যকর উদ্যোগও নেই। এটিএম বুথগুলোতে এখনই নানা কৌশলে ডিভাইস স্থাপন করে জালিয়াতরা তথ্য চুরি করছে। এতে করে খোয়া যাচ্ছে কোটি কোটি টাকা। ব্যাংকের কর্মকর্তারা ভয়ংকর এ জালিয়াতিতে জড়িত হওয়ায় বিস্মিত হয়েছেন অনেকে। তারা বলছেন, ‘সরষের মধ্যে ভূত’ ছাড়াও এর সঙ্গে আরও অনেকের যোগসূত্র রয়েছে। তাদেরও খুঁজে বের করা প্রয়োজন।

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, ব্যাংকের কর্মকর্তা ও এটিএম প্রযুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আইটি বিশেজ্ঞরা জড়িয়ে পড়েছেন কার্ড জালিয়াতির সঙ্গে। জালিয়াতদের সঙ্গে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের অনেকের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। তাদের ধরতে গোয়েন্দারা কিছু কৌশল অবলম্বন করেছেন। গোয়েন্দাদের পক্ষ থেকে বেশ কটি ব্যাংকের উচ্চপর্যায়ে ইতিমধ্যে ওই সব কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতার তথ্য দেয়া হয়েছে। আইনজ্ঞরা বলছেন, ক্রেডিট ও ডেবিট কার্র্ড জালিয়াত চক্রের বেশ কয়েকজন সদস্য এর আগেও ধরা পড়েছে। কিন্তু আইনের ফাঁকফোকর গলিয়ে তারা বের হয়ে যায়। বর্তমান আইনে জালিয়াতির দায়ে কেউ তিন মাস আবার কেউবা এক মাস জেল খেটে বের হয়ে আসে। এ ধরনের অপরাধীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা কিংবা বড় ধরনের আর্থিক অপরাধসহ জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা হলে তারা সহজে পার পাবে না।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, কার্ডের গ্রাহক সেজেও কোটি কোটি টাকা তুলে নিচ্ছে জালিয়াতরা। তাদেরই একটি চক্র এটিএম বুথে ক্যাশ লোডিংয়ের সময় কম টাকা লোড করছে। এতে করে বড় দাগের অর্থ এটিএম বুথ থেকে নিজের পকেটে নিচ্ছে চক্রটি। অবশ্য এই অর্থ গ্রাহকের খোয়া যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর ক্ষতি হচ্ছে।

ব্র্যাক হেড অব কমিউনিকেশনস অ্যান্ড সার্ভিস কোয়ালিটির কর্মকর্তা জিশান কিংশুক হক মুঠোফোনে যুগান্তরকে জানান, কার্ডধারীদের নিরাপত্তার জন্য ব্র্যাক ব্যাংক সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দিচ্ছে। বুথে বুথে থাকা নিরাপত্তা কর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দিয়েছি আমরা। তাদের বলা আছে কোনো সন্দেহভাজন দেখামাত্রই পুলিশ ও কর্তৃপক্ষকে অবগত করতে। তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতারক ও জালিয়াতরা প্রযুক্তি নিয়ে অগ্রসর হয়েছে। তারা গ্রাহকদের অজ্ঞতাও কাজে লাগাচ্ছে। জিশান কিংশুক বলেন, বাংলাদেশে কার্ডধারীর সংখ্যা ৪৮ লাখের ওপরে হবে। ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, ব্যাংকগুলো থেকে কার্ডধারীর সঠিক সংখ্যা বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রকাশ করা হয়নি। এর সঠিক পরিসংখ্যানও তৈরি হয়নি।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ জানায়, উচ্চতর প্রযুুক্তি জানা মোঃ সেলিম উদ্দিন সেলিম ২০০০ সালের শুরুর দিকে ‘আমরা টেকনোলজি’ নামে একটি আইটি প্রতিষ্ঠানের এটিএম শাখায় চাকরিতে যোগ দেন। ডাচ্-বাংলা ব্যাংক, ব্র্যাক ব্যাংক, ব্যাংক এশিয়া, প্রাইম ব্যাংক, ইউসিবিএল ও এবি ব্যাংকের এটিএম সার্ভিসের রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করতেন তিনি। একপর্যায়ে ডাচ্-বাংলা ব্যাংকে জালিয়াতি করে তার চাকরি চলে যায়। সেলিম তরুণ বিজ্ঞানী, ভালো কাজের জন্য পুরস্কৃত হয়েছিলেন। সেলিমের সঙ্গে আরিফ নামে আরও একজন আইটি বিশেষজ্ঞ এ অপরাধে নিজেকে জড়ান। মঞ্জুরুল ও আসাদুল মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের আইটি কর্মকর্তা। তারাও এই অপরাধে জড়িয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়েছেন। জালিয়াতি করে ধরা পড়ায় ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের মামলায় ২০০৮ সালে জেল থেকে বেরিয়ে এডিএন নামক একটি আইটি প্রতিষ্ঠানের এটিএম শাখায় যোগ দেন।
ব্যাংকের কার্ড ডিভিশনের ঊর্ধ্বতন ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে একটি শক্তিশালী চক্র নতুন নতুন উপায়ে কার্ড জালিয়াতি করছে। এরমধ্যে ভুয়া কার্ড তৈরি করে মালিক সেজে টাকা উত্তোলন করছে। প্রতি বছর এই চক্রটি কার্ড ডিভিশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়ে ২০ থেকে ৫০টি কার্ড তৈরি করে। এসব কার্ডের মাধ্যমে বিভিন্ন বুথ থেকে টাকা তুলে নেয় তারা। কার্ড ডিভিশনের একজন কর্মকর্তা জানান, প্রতি মাসে ক্রেডিট কার্ডে ন্যূনতম একটি অংকের টাকা জমা দিতে হয়। কিন্তু দেখা যায় যে কার্ডে যে নাম ও মোবাইল ফোন নম্বর দেয়া হয়েছেÑ ফোন নম্বরও বন্ধ এবং ঠিকানায় ওই নামে কোনো লোক নেই। পরে অভ্যন্তরীণ তদন্তে দেখা যায়, আইটি সেকশনের সঙ্গে জড়িতরাই এ কাজ করেছে। বিভিন্ন বুথের সিসি ক্যামেরা থেকে ভিডিও ফুটেজে তাদের টাকা তুলতে দেখা যায়।

ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মশিউর রহমান যুগান্তরকে বলেন, নতুন নতুন কৌশলে কার্ড জালিয়াত চক্র দেশে সক্রিয় হচ্ছে। আমরাও তাদের দমনের কৌশল অবলম্বন করছি। বিশেষ করে ব্যাংকের আইটি সেক্টরের লোকজন যখন এ অপরাধে জড়ান তখন এটি ভয়ংকর পর্যায়েই চলে যায়। এডিসি মশিউর রহমান বলেন, বাংলাদেশে কয়েকটি শক্তিশালী কার্ড জালিয়াত সিন্ডিকেট রয়েছে। ব্যাংকের ভেতরে ও বাইরে মিলে যেসব সিন্ডিকেট রয়েছে তাদের সবকটি চক্রকেই দমন করা হয়েছে। তবে চক্রের কিছু কিছু সদস্য এখনও অধরা আছে। তাদের ধরতে গোয়েন্দারা কাজ করছে। ডিবির সিনিয়র সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) তৌহিদুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, কয়েকটি ধাপে কার্ডধারীদের তথ্য চুরি করা হচ্ছে। বিশেষ করে যারা বুথে গিয়ে কার্ড পাঞ্চ করে তাদের অনেকেই সচেতন না। আর ব্যাংকগুলোও সে ধরনের সচেতনতা তৈরিতে সক্ষম হয়নি। গোয়েন্দা কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম বলেন, বুথের ভেতরে পিনকোড সংগ্রহের জন্য আলাদা ডিভাইস স্থাপন করে চক্রটি। তারপর কার্ডধারীর তথ্য নিয়ে নতুন কার্ড তৈরি করে টাকা উত্তোলন করে থাকে।

বিদেশে প্রযুক্তি নিয়ে পড়াশোনা করা যুবক মোশাররফ সম্প্রতি ডিবি পুলিশের অভিযানে ধরা পড়লে সে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছে। পিন কোড সংগ্রহ ও ডিভাইসে সোয়াপ করে কার্ডে তথ্য পেয়ে নতুন কার্ড তৈরি করে মোশাররফ। সে ব্লাংক কার্ডে সব তথ্য-উপাত্ত সংযোজন করে। এটি অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় বলে মনে করেন আইটি বিশেষজ্ঞরা। মোশাররফ স্বীকার করেন, বুথের ভেতর কার্ডের নিরাপত্তার জন্য কার্ডধারীদের সোয়াপ করতে বলা হয়। এতে করে সব তথ্য ওই ডিভাইসে ধরা দেয়। মোশাররফের তথ্য অনুযায়ী, কিছু কার্ডের তথ্য সে তার ব্লাংক কার্ডে প্রবেশ করালেও টাকা তুলতে পারেনি। কারণ অনেক কার্ডধারী বিষয়টি বুঝতে পেরে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে। ডিবি পুলিশের রিমান্ডে থাকা গ্রেফতার মঞ্জুরুল স্বীকার করেন, এবি ব্যাংকের এটিএম বুথে ক্যাশ লোডিং করার সময় তিনি টাকা কম দেন। এতে ধরার উপায় থাকে না। কর্তৃপক্ষ তার ওপর আস্থা রেখে মানি লোডিংয়ের দায়িত্বে রাখলেও কোটিপতি হওয়ার নেশায় তিনি কম লোড করতেন। তবে একপর্যায়ে কর্তৃপক্ষ তাকে সন্দেহ করে বসে। আরিফ স্বীকার করেন, ব্র্যাক ব্যাংকের বুথে তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং সাপোর্ট দিতেন। আইটি ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করায় আরিফের সঙ্গে অপরাধীদের সম্পর্ক রয়েছে। ভুয়া কার্ড তৈরি করে তিনি বুথে বুথে টাকা তুলতেন। বছর শেষে কার্ড ডিভিশনের কর্মকর্তারা টাকার হিসাব মেলাতে গিয়ে ভুয়া কার্ডের মালিকদের খুঁজে পায় না।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, গ্রাহকের প্রয়োজনমতো যে কোনো স্থান থেকে দিনের ২৪ ঘণ্টা নগদ টাকা উত্তোলন এবং কেনাকাটা শেষে অর্থ পরিশোধের মাধ্যম হিসেবে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডের ব্যবহার। সথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে কার্ড জালিয়াতি। এতে করে অসাধু চক্রের লোকজন হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি কোটি টাকা। শুধু বাংলাদেশে নয়, এ চক্রের জাল দেশের বাইরেও ছড়িয়ে রয়েছে।

বর্তমানে প্রায় সব ব্যাংকই এই দু’ধরনের কার্ড ইস্যু করে গ্রাহকদের। সুবিধার পাশাপাশি বেশ ঝুঁকির মুখে রয়েছেন কার্ড গ্রাহকরা। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, এ দেশের এটিএম বুথগুলো পুরনো প্রযুক্তির। বুথগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। আর বাংলাদেশে ম্যাগনেটিক স্ট্রিপের যে কার্ড ব্যবহার করা হয় তা জাল করা প্রতারকদের জন্য সহজ। বুথের কার্ড পাঞ্চ করার জায়গায় স্ক্যাম প্রতিরোধক কোনো ব্যবস্থাও নেই। তাই সেখান থেকেই গ্রাহকদের কার্ডের তথ্য চুরি হয়ে যাচ্ছে। ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি করার জন্য নতুন একটা সফটওয়্যার তৈরি করে জালিয়াতরা। এই সফটওয়্যার ক্রেডিট কার্ড পাঞ্চ মেশিনে স্থাপন করা হয়। এ মেশিনে কার্ড পাঞ্চ করলে ক্রেডিট কার্ডের গোপন নাম্বারসহ সব তথ্য এই সফটওয়্যারে সংরক্ষিত হয়। আবার কখনও বুথের সিপিউতে তারা পেন ড্রাইভের মত যন্ত্র ব্যবহার করে তথ্য চুরি করে। কার্ড জালিয়াত প্রতিরোধ নিয়ে কাজ করা ডিবির চৌকস কর্মকর্তা এডিসি মশিউর রহমান ও সিনিয়র এসি তৌহিদুল ইসলাম বলেন, জালিয়াতি চক্র অর্থ আÍসাতের জন্য প্রযুক্তিতে পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশের মতো দেশগুলোকে বেছে নিয়েছে। বাংলাদেশে ক্রেডিট ও ডেবিট কার্ডে এখনও মাইক্রো চিপস ব্যবহার শুরু হয়নি। মাইক্রো চিপস ব্যবহার শুরু হলে জালিয়াতি অনেকাংশে কমে যাবে।

মন্তব্য করুন

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  পরিবর্তন )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  পরিবর্তন )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  পরিবর্তন )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  পরিবর্তন )

Connecting to %s

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: